বাংলায় ইন্দ্রপতন, চলে গেলেন পদ্মশ্রী নৃত্যশিল্পী

651
বাংলায় ইন্দ্রপতন, চলে গেলেন পদ্মশ্রী নৃত্যশিল্পী/The News বাংলা
বাংলায় ইন্দ্রপতন, চলে গেলেন পদ্মশ্রী নৃত্যশিল্পী/The News বাংলা
Simple Custom Content Adder

ইন্দ্রপতন বাংলায়। লোকসংস্কৃতি জগতের প্রখ্যাত ছৌশিল্পী পদ্মশ্রী নেপাল মাহাতো পরলোক গমন করলেন। শনিবার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী মারা যান।

পুরুলিয়া, ময়ূরভঞ্জ, সরাইকেল্লা ছৌনাচের ত্রিধারায় ভারত তথা বিশ্বের বুকে এক অসাধারণ ছৌশিল্পী পদ্মশ্রী নেপাল মাহতো। ছৌ সম্রাট পদ্মশ্রী গম্ভীর সিংমুড়া প্রথম বিশ্বের দরবারে ছৌ নাচকে পৌছে দিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভবিষ্যতের ভূত মুখ পোড়াল রাজ্য সরকারের

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় পুরুলিয়ার শিল্পীকে তুলে ধরেছেন বিশ্বের দরবারে। সেই বিশ্ববিজয়ী নৃত্য পরম্পরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী, ওস্তাদ পদ্মশ্রী নেপাল মাহাতো।

জন্মপরিচয় : বরাবাজার ব্লকের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত আদাবনা গ্রামের এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে তাঁর জন্ম। স্রোতস্বিনী কুমারী নদীর জলাধারের ছলছলানো উপকন্ঠে আদাবনা গ্রামের নিসর্গ শোভায় তাঁর বেড়ে উঠা, গ্রামীণ সেই সৌন্দর্য কালে কালে শ্রী বৃদ্ধি করে চলেছে অনন্তের পথে।

আরও পড়ুনঃ তারকা যুদ্ধে বিজেপির বাজি শ্রাবন্তী, অগ্নিমিত্রা, চলছে জোর জল্পনা

সেই শ্রী হ্রী-র লাবণ্য মাখা প্রকৃতির বুকেই নেপাল মাহাতো লালিতপালিত। পিতা নগেন্দ্রনাথ মাহাতো ও মাতা তুষ্ট মাহাতোর পঞ্চম সন্তান তিনি। ১৯৫৪ সালের ১৭ই জুন শ্রীনেপাল মাহাতো জন্মগ্রহণ করেন।

বাল্যশিক্ষা: দশ বছর বয়সে আড়ষা থানার কাণ্টাডি শিক্ষাসত্রে তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে লেখাপড়ার জন্য ভর্তি হন। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন সময়েই তাঁর ছৌনাচে হাতে খড়ি। ছৌওস্তাদ অনিল মাহাতোর তত্বাবধানে তিনি ছৌ নাচের তালিম নিতে শুরু করেন।

ছৌনাচের প্রতি ভালোবাসা আর অনুরাগ এভাবেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এর সাথে যুক্ত হয় মানভূমের লোক সংস্কৃতির কাড়া লড়াই, নাচনী নাচ প্রভৃতির প্রতি অনুরাগ। আর অন্যদিকে ফুটবল খেলার প্রতিও নেপাল মাহাতোর আকর্ষণ খুব ছোটোবেলা থেকেই।

আরও পড়ুনঃ মা মাটি মানুষ এখন শুধুই মানি মানি মানি

পড়াশুনার পাশাপাশি ছৌনাচের প্রতি শ্রী নেপাল মাহাতোর একান্ত আবেগ তাঁকে প্রকৃত অর্থেই ছৌনাচের শিল্পী রূপে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ১৯৭৩ সালে তিনি কান্টাডি হাই স্কুল থেকে ফাইন্যাল পরীক্ষায় সম্মানের সংগে উত্তীর্ণ হন।

ছৌ দল গঠন: ১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি নিজের প্রচেষ্টায় ছৌদল গঠন করেন। ১৯৭৫ সালে কান্টাডি শিক্ষাসত্রের এক বার্ষিক অনুষ্ঠানে ঝুমুর গানের মাধ্যমে নিজের লোক প্রতিভা তুলে ধরেন। এরপর তাঁকে আর ফিরে তাকাতে হয় নি।

লোক সংস্কৃতির জহুরী কান্টাডি শিক্ষাসত্রের সম্পাদক মাননীয় অজিত মিত্রের সান্নিধ্যে তিনি আসেন। অজিত মিত্রের উদ্যোগ ও সহায়তায় তিনি বিভিন্ন স্থানে ছৌনাচের প্রদর্শন করার মধ্য দিয়ে এই শিল্পের প্রতি অতি মনোযোগী হতে থাকেন।

এই মহতী কাজে সহায়তা করেন ছৌপ্রেমী দুলাল চৌধুরী।
এভাবেই তাঁর শিল্পসাধনা শক্ত ভিত্তিভূমির উপর দাঁড়ায়। নিজের অদ্ভুত কলাকৌশল দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন সবাইকে।

আরও পড়ুনঃ মিমি নুসরত এর চরিত্র নিয়ে কটাক্ষ বিতর্কে জড়ালেন দিলীপ ঘোষ

১৯৮০ সালে একাডেমী অব ফোকলোরের উদ্যোগে চল্লিশটি ছৌদলের ছৌনাচের প্রতিযোগিতায় শিল্পী নেপাল মাহাতো প্রথম স্থান অধিকার করেন। এবং ঠিক তার পরের বছরই ICCR এর আধিকারিক কে,এস, মাথুরের উপস্থিতিতে ডায়মন্ড হারবারে নৃত্যশৈলী প্রদর্শন করে উপস্থিত সকলকে মোহিত করে তোলেন । এভাবেই ধীরে ধীরে প্রতিভা স্ফুরণের সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে যোগ্যতার পরিচয় রাখতে রাখতে এগিয়ে যেতে থাকেন।

বিশ্বজয় : ১৯৮২ সালে ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরে ১৫ দিনের সফরে প্রথম বিদেশের মাটিতে পা রাখেন। প্রসংগত বলা ভালো যে এর আগেই পদ্মশ্রী গম্ভীর সিংমুড়া ১৯৭২ সালে এবং ১৯৭৫ সালে ইউরোপ আমেরিকার মাটিতে ছৌনাচকে তুলে ধরেছেন। এবং ১৯৮১ সালে গম্ভীর সিংমুড়া ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মশ্রী সম্মানে বিভূষিত হন।

এরূপ আবহে এবং ছৌনাচের বিশ্ব পরিভ্রমণপথের এক উল্লেখযোগ্য স্বপ্নসন্ধানী রূপে শ্রীনেপাল মাহাতো লন্ডনের নানান স্থানে ছৌনাচের তাল লয় মান তুলে ধরে স্বীয় প্রতিভার চূড়ান্ত স্বাক্ষর রেখেছেন।

ধারাবাহিকভাবে এই নাচের প্রতি ঐকান্তিকতা, শ্রী মাহাতোর ছৌনাচের টান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক, শিক্ষানুরাগী, লোকপ্রিয় তথা লোকসংস্কৃতি অন্ত:প্রাণ মাননীয় অজিত মিত্রের প্রচেষ্টা জারি থাকে।

সম্মাননা প্রাপ্তি: নেপাল মাহাতোর অক্লান্ত প্রচেষ্টা আর শিল্পসাধনার চূড়ান্ত অনুরাগের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৮৩ সালে ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী সম্মানে তিনি ভূষিত হন। তত্কালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি মহাশয় পদ্মশ্রী সম্মানে তাঁকে ভূষিত করেন। এর ফলে সারাদেশের বুকে আবারো ছৌনাচ এবং এ জেলার লোকশিল্পী রূপে সমাদর লাভ করেন।

১৯৮৫ সালে ছোটোনাগপুরের ফেস্টিভ্যালে ছৌনৃত্য পরিবেশন করে সেখানে অত্যন্ত সমাদর লাভ করেন।

আরও পড়ুনঃ মমতার প্রার্থী তালিকা নিয়ে গোপনে ক্ষোভ বাড়ছে জেলায় জেলায়

বিশ্বে ছৌনাচ প্রদর্শন : ১৯৮৬ সালে ৯০ দিনের সফরে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন শহরে প্রত্যন্ত এক গ্রামের শিল্পী তাঁর ঐতিহ্যবাহী ছৌনাচকে তুলে ধরে ঐতিহাসিক এক সন্ধিক্ষণে নিজেকে এবং বীর রসাত্মক নৃত্য ধারাটিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

১৯৮৭ সালের সুইডেন সফরে ৬০ দিনের অবস্থিতি কালে সেখানকার দর্শককূল সম্মোহিত হন।

১৯৮৯ সালে আবার ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড এবং আবারো লন্ডনের বিভিন্ন সুরম্য প্রেক্ষাগৃহে ছৌনাচের ট্র‍্যাডিশন, জনপ্রিয় নৃত্যনাট্যগুলি তুলে ধরে পুরুলিয়ার মতো এক জেলার সুনাম বজায় রাখেন।

১৯৯৫ সালে থাইল্যান্ডের মাটিতে তাঁর লোক- প্রতিভার চূড়ান্ত স্ফুরণ ঘটে।

১৯৯৮ সালে কানাডার বুকে লোকনাচের আসর বসে। সেখানে তিনি এবং তাঁর ছৌদল মান্যতা পায় অসাধারণ শিল্পচেতনায়। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার বুকে প্রাচ্য সংস্কৃতির বীররসের লোকনৃত্য ধারাটিকে প্রতীচ্যের মানুষের কাছে নন্দিত লহরে শিল্পসুষমায় মন্ডিত করে তুলে ধরে পদ্মশ্রী নেপাল মাহাতো আমাদের গৌরবান্বিত করেছেন।

সর্বশেষ ২০১২ সালে তিনি পুনরায় লন্ডনের মাটিতে ছৌনাচের আসর মাতিয়ে তোলেন।

অন্যদিকে, ১৯৮২ সালেই তিনি আদাবনা গ্রামে ছৌনাচের ট্রেনিং সেন্টার খুলে নবীন শিল্পীদের এ নাচের তালিম দিতে থাকেন। আজ অবধি পাঁচশোর বেশি ছৌশিল্পীকে বিভিন্ন বিষয়ে হাতে কলমে, শারীরিক কসরত প্রকরণ প্রকৌশলে সমৃদ্ধ করেছেন।

সবচেয়ে আনন্দের নেতাজী সুভাষ আশ্রম মহাবিদ্যালয়ে ‘ছৌনাচ ও মুখোশ নির্মাণ’ বিষয়ের উপর যে পাঠ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়,তার শুভ উদ্বোধন করেন তিনি। এর উদ্যোক্তা ছিলেন সুইসা কলেজের অধ্যক্ষ ড. নচিকেতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

উপস্থিত ছিলেন অন্যতম ছৌ অনুরাগী মলয় চৌধুরী। সেই শুভ সুচনা আজ সিধো কানহো বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তরোত্তর এগিয়ে চলেছে।

১৯৯৪ সাল থেকে দিল্লীতে তিনি ড. আম্বেদকর ফেলোশিপের একজন অতিথি লোকবিশেষজ্ঞ রুপে দক্ষতার সাথে কাজ করে এসেছেন।আবার কর্মজীবনে আদাবনা হাইস্কুলে তাঁর শিক্ষাঙ্গনে ভূমিকা অনস্বীকার্য।

এভাবেই ছৌনাচের পরম্পরাকে তিনি নিজে এবং তাঁর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে প্রসার ঘটিয়েছেন। তাঁর কাছে ছৌনাচই জীবন এবং জীবনের ক্ষেত্রে দিবসের চিন্তা, রাত্রির স্বপ্ন আর জীবনের ধ্রুবতারাই ছৌনাচ।

শুভ শক্তির সাথে অশুভ শক্তির যে দ্বন্দ্ব ছৌনাচের পালার প্রাণধর্ম, সেই দ্বান্দ্বিকতার ভিতরে শুভত্বের শিল্পিত রূপদক্ষ শিল্পী পদ্মশ্রী নেপাল মাহাতো।অসংখ্য পুরষ্কার, সম্মানে তিনি ভূষিত, সবচেয়ে বড়ো সম্মান তাঁর চার বছরের নাতি ছৌনাচের তালিম নিচ্ছে, এর থেকে বড়ো প্রাপ্তি আর কি হতে পারে।

লেখক: ড.দয়াময় রায়।

আরও পড়ুনঃ অর্জুনের হাত ধরে বারাকপুর লোকসভা ছিনিয়ে নিতে পারে বিজেপি
আরও পড়ুনঃ ম্যায় ভি চৌকিদার হু, আমজনতাকে ভোটের স্লোগান জানিয়ে দিলেন মোদী
আরও পড়ুনঃ ৪২টি কেন্দ্রে জেতানোর প্রার্থী নেই, অন্য দল থেকে আসা নেতার ভরসায় দিলীপ
আরও পড়ুনঃ পশ্চিমবঙ্গে নজিরবিহীন ৭ দফা ভোটে সুবিধা বিজেপির
আরও পড়ুনঃ বাংলার কোন লোকসভা আসনে কবে ভোট দেখে নিন

আপনার মোবাইলে বা কম্পিউটারে The News বাংলা পড়তে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ।

Comments

comments

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন