বাংলায় কিভাবে শুরু হল জগদ্ধাত্রী পূজা

644
Image Source: Google

The News বাংলা, কৃষ্ণনগর: বাংলায় কিভাবে শুরু হল জগদ্ধাত্রী পুজো? জগদ্ধাত্রী পূজা একটি বিশিষ্ট উৎসব হলেও, দুর্গা বা কালীপূজার তুলনায় এই পূজার প্রচলন অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে ঘটে। অষ্টাদশ শতকে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁর রাজধানী কৃষ্ণনগরে এই পূজার প্রচলন করার পর এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

যদিও দেবী জগদ্ধাত্রী যে বাঙালি সমাজে একান্ত অপরিচিত ছিলেন না, তার প্রমাণও পাওয়া যায়। শূলপাণি খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে কালবিবেক গ্রন্থে কার্তিক মাসে জগদ্ধাত্রী পূজার উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুনঃ কেন মা কালীর পায়ের নিচে বাবা মহাদেব

এমনকি, পূর্ববঙ্গের বরিশালে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে নির্মিত জগদ্ধাত্রীর একটি প্রস্তরমূর্তি পাওয়া যায়। বর্তমানে এই মূর্তিটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালার প্রত্নবিভাগে রক্ষিত।

Image Source: Google

কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালের আগে নির্মিত নদিয়ার শান্তিপুরের জলেশ্বর শিবমন্দির ও কোতোয়ালি থানার রাঘবেশ্বর শিবমন্দিরের ভাস্কর্যে জগদ্ধাত্রীর মূর্তি লক্ষিত হয়। তবে বাংলার জনসমাজে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বে জগদ্ধাত্রী পূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি। কেবল কিছু ব্রাহ্মণগৃহে দুর্গাপূজার পাশাপাশি জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হত।

আরও পড়ুনঃ জেনে নিন সিদ্ধপুরুষ ‘জয় বাবা লোকনাথ’ এর অজানা কাহিনী

নদিয়া জেলার সদর কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। প্ৰচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তখন বাংলার মসনদে আসীন নবাব আলিবর্দি খাঁ। তাঁর রাজত্বকালে রাজার কাছ থেকে বারো লক্ষ টাকা নজরানা দাবি করা হয়। কৃষ্ণচন্দ্র তা দিতে অস্বীকার করলে তাঁকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় মুর্শিদাবাদে।

The News বাংলা

নবাবকে খুশি করে, ছাড়া পেয়ে রাজা যখন নদীপথে কৃষ্ণনগরে ফিরছেন, শুনতে পেলেন বিসর্জনের বাজনা। ভারাক্রান্ত হল তাঁর মন- এ বছর আর দুর্গাপুজো করা হয়ে উঠল না! দুর্গাপূজার আয়োজন করতে না পেরে রাজা অত্যন্ত দুঃখ পান। জনশ্রুতি, সেই রাতেই রাজাকে স্বপ্নে দর্শন দেন জগদ্ধাত্রী। পরের শুক্লানবমী তিথিতে তাঁর পূজার নির্দেশ দেন যা দুর্গাপূজারই সমতুল।

আরও পড়ুনঃ ‘তাজমহল’ গড়া শেষ না করেই মারা গেলেন ‘শাহজাহান’

সেই ১৯৬৬ সাল থেকে কৃষ্ণনগরে দুর্গাপুজোর বিকল্প হিসেবে প্রচলিত হল জগদ্ধাত্রীর পূজা। ১৭৭২ সালে রাজবাড়ির দেখাদেখি কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রজারা জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করেন। বুড়িমার পূজা নামে পরিচিত পূজা শুরু হয়েছিল ঘটে ও পটে।

Image source: Google

চন্দননগরেও সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ। কৃষ্ণচন্দ্রের পূজায় অনুপ্রাণিত হয়ে ফরাসিদের দেওয়ান রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরি শুরু করলেন তৎকালীন ফরাসডাঙা বা অধুনা চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পূজা। যা পরে বিকল্প এক উৎসবের আকার নিল।

আরও পড়ুনঃ ‘ম্যাডামে’র মুখের আদলেই দেবী দুর্গার মুখ

প্রায় আড়াইশো বছর আগে, কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পূজা দেখে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্রনারায়ণ চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টির নিচুপাটিতে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন। লক্ষ্মীগঞ্জ প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরেই এই পূজার সূচনা। এই পূজা চন্দননগরে আদি পূজা নামে পরিচিত।

Image Source: Google

এখনও পর্যন্ত পুরুষানুক্রমে দেওয়ান চৌধুরীদের উত্তরপুরুষের নামে পূজার সংকল্প হয়। এখানকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল সনাতনরীতির প্রতিমায় সাদা সিংহ এবং বিপরীতমুখী অবস্থানে হাতি। শোনা যায়, বিসর্জনের সময় আদি প্রতিমা জলে পড়লেই শুশুক বা সাপের দেখা পাওয়া যায়। স্থানীয় বিশ্বাসে এই দেবী অত্যন্ত জাগ্রতা।

আরও পড়ুনঃ বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্পের বেশ কিছু অজানা কাহিনী

লক্ষ্মীগঞ্জ কাপড়েপট্টির জগদ্ধাত্রী পূজা চন্দননগরে দ্বিতীয় প্রাচীনতম পূজা। ১৭৬৮ সালে চাউলপট্টির চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতান্তর হওয়ায় কাপড় ব্যবসায়ী শ্রীধর বন্দ্যোপাধ্যায় (মতান্তরে শশধর) রীতিমতো চাঁদা তুলে এই পূজা প্রবর্তন করেন।

Image Source: Google

আবার, এক দেবীর পূজায় অসমর্থ হয়ে জগদ্ধাত্রী আরাধনার প্রচলন দেখা যায় মা সারদামণির বংশেও। শোনা যায়, সারদামণির মা শ্যামাসুন্দরী দেবী প্রতি বছর প্রতিবেশি নব মুখুজ্যের বাড়ির কালীপুজোয় চাল পাঠাতেন।

আরও পড়ুনঃ অজানা কাহিনির আড়ালে সিদ্ধপিঠ তারাপীঠের তারা মা

একবার ঝগড়ার জন্য মুখুজ্যেরা সেই চাল নিতে অস্বীকার করেন। শ্যামাসুন্দরীকে সেই রাতেই স্বপ্নে দর্শন দেন জগদ্ধাত্রী। ওই চালে তাঁর পূজার নির্দেশ দেন। সেই থেকে জয়রামবাটীতে সারদামণির বংশে জগদ্ধাত্রী পূজা বিখ্যাত।

কাহিনী অনুসারে, এইভাবেই বাংলায় প্রচলিত হয় জগদ্ধাত্রী পূজা। যা এখন দুর্গাপুজোর মতই বড় পুজোর আকার নিয়েছে বাংলার বেশ কিছু জেলায়। আর বাকি বাংলাতেও, জগদ্ধাত্রী পূজা দিয়েই উৎসবের মরসুম শেষ হয়।

Comments

comments

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন