এক বাংলা থেকে আগেই গায়েব হয়েছে, আর এক বাংলা থেকে গায়েব হবার রাস্তায়

182
Bangladesh Bangla Bhasha Dibas
ভাষা দিবস The News Bangla

ভাষা দিবস কি এখন শুধুই ফালতু আদিখ্যেতা? এমনটাই উঠে গেছে প্রশ্ন। এক বাংলা থেকে আগেই গায়েব হয়েছে; আর এক বাংলা থেকে গায়েব হবার রাস্তায় বাংলা ভাষা।
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি; আমি কি ভুলিতে পারি”। আর এখন বলা হচ্ছে; আদিখ্যেতা ছেড়ে ভুলে যান তাড়াতাড়ি। একদম ঠিক পড়ছেন। যত তাড়াতাড়ি এই আবেগকে ভুলে যাবেন, তত ভালো; তত নিজের কাছে সৎ থাকবেন। চোখ বুজে থাকলে সত্যটা মিথ্যা হবে না। কিন্তু কেন?

মুখের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে; বিরল ইতিহাস গড়েছিল বাঙালি। উর্দুর পাশাপাশি প্রাণের ভাষা বাংলাকে; পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গড়ে ওঠে দুর্বার আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি; সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত, রফিকদের তাজা রক্তে লাল হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। বাংলা ভাষা রক্ষায়, মাতৃভাষা রক্ষায়; হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির রক্ত ঝরানো লড়াইয়ে মুগ্ধ হয়েছিল গোটা পৃথিবী। তারই পথ ধরে শুরু হয় বাঙালির ভাষা আন্দোলন; যার জেরে বাংলা ভাষা পায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। ২১ শে ফেব্রুয়ারি বিশ্ব জুড়ে ভাষা দিবসের স্বীকৃতি; ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯, ইউনেস্কোর ঘোষণার পর। মাতৃভাষা রক্ষার লড়াই, বিশ্ব সংসারে বিরল; অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছিল বাঙালিই।

“মোদের গরব, মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা!
তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা”!
ইতিহাস, আবেগ ওখানেই শেষ। ৭১ এ স্বাধীনতার পরের ৫০ বছরে আমূল বদলে গেছে বাংলাদেশ। বলা ভাল, ফের ১৯৪৭ এ ফিরে গিয়ে; বাংলাদেশ এখন আবার পুরোপুরি পূর্ব পাকিস্তান হয়ে গেছে। তফাৎ একটাই, এখন সেটা হয়েছে ধর্মে মনুষত্বে ও সর্বোপরি ভাষায়।

১৯৪৭ এ বাঙালি মুসলিম-হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্তানে পড়েছিল দেশভাগের জেরে। ১৯৭১ এ বঙ্গবন্ধু মুজিবের হাত ধরে বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ে; ইন্দিরার ভারতের সাহায্যে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়েছিল। ২০২২এর ২১ শে ফেব্রুয়ারি সেই আবেগের লেশমাত্র নেই বাংলায়। বাংলাদেশ আবার হয়েছে পূর্ব পাকিস্তান। ‘পুরোনো বাবার নির্দেশে’ পাকিস্তানের মতোই ‘হিন্দু খেদাও’ অভিযান; গত দু-তিন দশক আগে থেকেই শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলা ভাষা প্রায় উধাও; দাপট বেড়েছে আরবি-উর্দু শব্দের। বাঙালি রীতি উধাও; ঠিক পাকিস্তানের মতোই ভাঙছে একের পর এক মন্দির। লোটা-কম্বল নিয়ে দেশ বাংলা ছেড়ে রাজ্য বাংলায় আজও পাড়ি দিচ্ছে হাজার হাজার মানুষ; হিন্দু বাঙালি। পিঠে কাঁটাতারের দাগ।

বাংলা বর্ণমালা এখন বাংলাদেশের কাছেই অচেনা শব্দ। তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলা অক্ষরমালা। কী চেয়েছিলেন জব্বর, বরকত, রফিক, সালামরা? চেয়েছিলেন মাতৃভাষার মর্যাদা; বাংলা ভাষার সম্মান প্রতিষ্ঠা। প্রতিবাদ করেছিলেন মাতৃভাষার অবমাননার বিরুদ্ধে। তার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছিল তাঁদের; ঢাকার রাজপথে।

এখন ইংরেজি মাধ্যমের দাপটে; বাংলা মাধ্যমে পড়ার বিদ্যালয়গুলি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক। সেটাও একটা ইস্যু। কিন্তু বাংলা ভাষা, বাংলা শব্দই আজ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের শব্দ কোষ থেকে। জায়গা নিচ্ছে একের পর এক আরবি-ফার্সি-উর্দু ও অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত ভাষা শব্দ। বিলুপ্ত হয়েছে বাংলা ভাষা; যার জন্য ভাষা দিবস।

“বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ; বারান্দায় লাগে জ্যোৎস্নার চন্দন”। ২০২২ এ বসে কবি শামসুর রহমানের কলমে এই লাইন আসতই না। বাংলা ভাষা এখন আর উচ্চারিতই হয় না; তো অন্ধ বাউলের একতারা কোথায় বাজবে?

“ওরা আমার মুখের কথা কাইরা নিতে চায়।
তারা কথায় কথায় শিকল পড়ায় আমার হাতে পায়।।
কইতো যাহা আমার দাদায়
কইছে তাহা আমার বাবায়
এখন, কও দেখি ভাই মোর মুখে কি
অন্য কথা শোভা পায়।।
সইমু না আর সইমু না
অন্য কথা কইমু না
যায় যদি ভাই দিমু সাধের জান”…..।।

এই কবিতা এই বাংলাদেশে আর কেউ পড়ে না; এই কবিতার আজ আর আদৌ কোন অস্তিত্বই নেই। বাংলাদেশ আজ বাংলা ভাষা ভুলে; শুধুই এক কট্টরপন্থী মুসলিম দেশ। আর সেই দেশের বড় শত্রু এখন ভারতবর্ষ পশ্চিমবঙ্গ। তাই আজ এই আবেগকে, বাড়ির পাশের পানা পুকুরে বিসর্জন দিন। সত্যকে স্বীকার করতে শিখুন; গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে। ভাষা দিবসে নিন শপথ। বাংলাদেশের কথা ছাড়ুন; অন্তত পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাকে বুক দিয়ে আগলান। ওটাও না ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। সেই পথে চলা শুরু হয়ে গেছে; বিশ্বাস না হলে বাড়ির বাচ্চার সরকারি স্কুলের বইটা দেখুন।

‘সামাল সামাল’…..
না হলে আর কয়েকবছর পরে আজকের দিনটা এই বলে স্মরণ করতে হবে যে…
‘অতীতে বাংলা বলে একটা ভাষা ছিল এই বাংলায়’…

সম্পাদকীয় লিখলেন মানব গুহ।

Comments

comments

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন