১৯৯৯ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি দিল্লি ইসলামাবাদ প্রথম বাস যাত্রার সময় এই বাসেই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী লাহোর সম্মেলনে যোগ দিতে রওনা হন এবং ওয়াঘা সীমান্তে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ তাঁকে স্বাগত জানান। বাজপেয়ীর বাস যাত্রা উভয় দেশের জনগণ সাদরে গ্রহণ করে ও সমগ্র বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিত হয়। দুই দেশের সরকার ১৯৯৯-এর লাহোরে ঘোষণা করেন, কাশ্মীর সমস্যা সহ উভয় দেশের বিবাদের শান্তিপূর্ণ সমাধান ও সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের পক্ষে জোর দেওয়া হবে।
কিন্তু একদিকে যখন ভারত পাক শান্তির বাস যাত্রা চলছে তখনই পাক সেনা ও জঙ্গিদের দল দখল নিচ্ছে কার্গিল সহ ভারতের একের পর এক পাহাড়। ১৯৯৯ সালের মে মাস। হঠাৎ খবর পাওয়া গেল কাশ্মীরের কার্গিল সেক্টর দখল করে নিয়েছে পাকিস্তানি সেনা ও জঙ্গিরা। তাদের সরিয়ে কার্গিল পুনর্দখল করা আজ ভারতবাসীর কাছে গৌরবময় ইতিহাস।
তাদের হঠাতে ভারতীয় সেনা শুরু করে ‘অপারেশন বিজয়’। দীর্ঘ তিন মাস কঠিন লড়াইয়ের পর কাশ্মীরের ওই এলাকা দখলমুক্ত করে ফের ভারতের পতাকা ওড়াতে সক্ষম হয় ভারতের বীর সেনা জওয়ানরা। কার্গিল যুদ্ধ জিততে বায়ুসেনার শক্তি দারুন ভাবে কাজে লাগিয়ে ছিল ভারত। ৩২ হাজার ফুট উঁচুতে উঠে ভারতীয় সেনা সীমান্তে পাক সেনা, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি ঘাঁটি খুঁজে বের করে হামলা চালায়।
সরকারিভাবে ‘অপারেশন বিজয়’র সাফল্যের কথা ২৬শে জুলাই ঘোষণা করা হয়। এরপর ৬০০ শহিদের বদলা নিতে ভারতীয় বায়ুসেনা পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জঙ্গি ঘাঁটিগুলিতে হামলার অনুমতি চান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার সেই হামলার অনুমতি দেননি। কিন্তু কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ৪৯ জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যুর পর আর ভুল করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
পাকিস্তানের মাটিতে ঢুকে জঙ্গি মারল ভারতের বিমান। সবুজ সংকেতের অপেক্ষাতেই ছিল ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স। ঠিক যেন সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পুনরাবৃত্তি। তবে এবার মাটিতে নয়। আকাশপথে। পাকিস্তানের মাটিতে ঢুকে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করল ভারতীয় যুদ্ধবিমান। পুলওয়ামা কাণ্ডের বদলা নিতে এক হাজার কেজি বোমা ফেলে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল পাক মাটিতে তৈরি হওয়া একাধিক জঙ্গি ঘাঁটি। হামলার কথা স্বীকার করে নিয়েছে পাকিস্তানও।
কার্গিলের সময়ই এই হামলা চালানোর প্রয়োজন ছিল বলেই বারবার জানিয়েছে ভারতীয় বিমান বাহিনী। এবার সেই সুযোগ আর হাতছাড়া করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় সরকার। পাকিস্তানে ঢুকে ৩টি জায়গায় প্রায় ১০০০ কেজি বোমা ফেলে তারা। ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয় বালাকোট, মুজাফরাবাদ ও চকোটিতে জঙ্গিশিবিরগুলি। ২০ মিনিটের মধ্যে অপারেশন শেষ করে ভারতে ফেরে বিমানগুলি। এই হামলায় জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটি সহ বহু জঙ্গিশিবির গুঁড়িয়ে দিয়েছে বায়ুসেনা। খতম করা হয়েছে ৩০০ জঙ্গিকে।
]]>পাকিস্তানের নাম করলেন না। কিন্তু প্রতিবেশী দেশকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অক্ষরে অক্ষরে বুঝিয়ে দিলেন, বড় ভুল করেছে পাকিস্তান। পরিস্কার বলে দিলেন, “চরম মূল্য চোকাতে হবে তাদের”। শুক্রবার, দিল্লিতে বন্দে ভারত এক্সপ্রেস উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্পষ্ট বুঝিয়ে দেন, গতকালের পুলওয়ামা জঙ্গি হামলার কড়া জবাব দেবে ভারত। তার জবাব দিতে সেনাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে বলে এ দিন প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যেই জানিয়ে দিলেন।
পুলওয়ামা ঘটনায় বিরোধীদের প্রতিও বার্তা দিলেন নরেন্দ্র মোদী। জঙ্গি হামলা নিয়ে কংগ্রেস বৃহস্পতিবার প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে মোদীকে নিশানা করে। কংগ্রেসের মুখপাত্র রণদীপ সুরজেওয়ালা বলেন, জওয়ানদের নৃশংস হত্যার পর কোথায় গেল মোদীর ৫৬ ইঞ্চি ছাতি? দেশের জওয়ানের এই হত্যা কেন? জবাব চায় দেশবাসী।
শুক্রবার, বিরোধীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যাঁরা পুলওয়ামা ঘটনায় সমালোচনা করছেন, তাঁদের ভাবনার সম্মান করি। কিন্তু এ ঘটনা সংবেদনশীল। রাজনৈতিক উর্ধ্বে এই সমস্যার মোকাবিলা করা উচিত সবার”। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সব দেশ যে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে, তা স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।
নরেন্দ্র মোদী বলেন, “বিশ্বের প্রায় সব দেশই ভারতের পাশে রয়েছে। এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা জানিয়েছে সব মহল”। সব দেশকে এই ভাবেই ভারতের পাশে থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। নাম না করে পাকিস্তানের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আর্থিক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিবেশী দেশ যদি ভেবে থাকে ভারতকে এভাবে বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে, তা হলে তারা ভুল ভাবছে। এই হামলার জবাব চাইছে ১৩০ কোটি দেশবাসী”।
এ দিন শহিদ সিআরপিএফ পরিবারদের প্রতি সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, দেশের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি এই দুটো স্বপ্নকে সার্থক করতেই শহিদ হন জওয়ানরা। এদিন দেশের দ্রুততম ট্রেন বন্দে ভারত এক্সপ্রেস উদ্বোধনে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে দাঁড়িয়েই এদিন নাম না করে পাকিস্তান ও জঙ্গিদের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিয়ে মোদী বলেন, “এই ঘটনার জন্য বড় মূল্য চোকাতে হবে পাকিস্তান ও জঙ্গিদের”।
এদিন কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়ে মোদী বলেন, “মোস্ট ফেবার নেশন নয় পাকিস্তান। ভারতের সেনার উপর আস্থা রয়েছে। প্রতিবেশি দেশ যদি ভেবে থাকে এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে তারা পার পেয়ে যাবে তবে তারা ভুল ভাবছে। ষড়যন্ত্র করে পার পাবে না ওরা। এর মূল্য ওদের চোকাতেই হবে”। পাশাপাশি, এই ঘটনার পর সমস্ত দেশকে ভারতের পাশে থাকার বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে তিনি বলেন, “দেশের জনগনের রক্ত ফুটছে। এর জবাব তো পাকিস্তানকে দিতেই হবে”।
উল্লেখ্য, গতকাল ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর এদিন উপত্যকার নিরাপত্তা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার একাধিক সদস্য। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারমন, সুষমা স্বরাজ, পীযূষ গোয়েলের মতো ব্যক্তিরা। সেই বৈঠকের পরই এদিন কড়া বার্তা দিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
]]>বৃহস্পতিবার জম্মু-শ্রীনগর জাতীয় সড়ক দিয়ে সিআরপিএফ জওয়ানদের ৫৪ নম্বর ব্যাটেলিয়নের একটি কনভয় যাচ্ছিল। প্রায় ২৫০০ জওয়ানের একটি দলকে জম্মু থেকে কাশ্মীর নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এই কনভয়েই একটি গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। জানা গেছে, এই গাড়িতেই ছিলেন হাওড়ার বাবলু সাঁতরা। প্রথমে সেই কনভয়ে আইইডি বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। সেনা সূত্রে খবর, বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি গিয়ে ধাক্কা মারে সিআরপিএফ এর একটি গাড়িতে। প্রায় ৩৫০ কেজি বিস্ফোরক ছিল ওই মহিন্দ্রা গাড়িতে।
জানা গিয়েছে, বিস্ফোরক ভর্তি গাড়ি চালাচ্ছিল জইশ জঙ্গি আদিল আহমেদ। বছর দেড়েক আগে জঙ্গি সগঠনে যোগ দিয়েছিল আদিল। এই বিস্ফোরণেই নিহত হন ৪৪জন জওয়ান। তারপর ছত্রভঙ্গ জওয়ানদের উপর গুলিবৃষ্টি করতে থাকে জঙ্গিরা। এই হামলার দায় নিয়েছে জইশ ই মহম্মদ। শুক্রবারই কাশ্মীরে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিং, সঙ্গে সিআরপিএফ এর ডিজি। সকালেই উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
সেনা সূত্রে খবর, জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়েতে অবন্তীপুরা এলাকায় হঠাৎই কনভয়ের মাঝে ঢুকে আসে একটি মহিন্দ্রা স্করপিও গাড়ি। যাতে প্রায় ৩৫০ কেজি আইইডি বোঝাই করা ছিল৷ সেনা কনভয়ের সঙ্গে ধাক্কায় প্রবল বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর কনভয়টিকে ঘিরে ফেলে জঙ্গিরা। লাগাতার গুলি চালিয়ে ঝাঁজরা করে দেওয়া হয় গাড়িটিকে। শহিদ হন ৪৪ জন সিআরপিএফ জওয়ান, গুরুতর জখম হয়েছেন আরও ১৫ জন। বেসরকারি মতে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
দেশ জুড়ে বদলার দাবি, নিকেশ করা হোক কাশ্মীরের জঙ্গিদের। এখন আর কোন আলোচনা নয়, বদলার দাবি গোটা দেশ জুড়ে। জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামায় হামলার ঘটনার নিন্দা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ট্যুইটে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, “পুলওয়ামায় সিআরপিএফ জওয়ানদের ওপর হামলার ঘটনা নিন্দনীয়। আমি এই ধরণের কারপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা করছি। আমাদের বীর নিরাপত্তাকর্মীদের বলিদান বিফলে যাবে না। বীর শহিদদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে গোটা দেশ। আহতরা দ্রুত আরোগ্যলাভ করুন”। এদিকে ক্রিকেটের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের মাটিতে সমস্ত রকম খেলা নিষিদ্ধ করা হল।
লোকসভা নির্বাচনের আগে জম্মু-কাশ্মীরে এই বড়সড় জঙ্গি হামলা ভোট বানচাল করা ও সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের বদলা বলেই দাবি করেছে জঙ্গি সংগঠন জইশ ই মহম্মদ। তদন্তে উঠে আসছে, বিস্ফোরক বোঝাই গাড়ি নিয়ে আত্মঘাতী হামলার তথ্য। আদিল আহমেদ নামে এক জইশ জঙ্গি এই আত্মঘাতী হামলা চালায় বলেই প্রাথমিক রিপোর্ট। এই ঘটনায় পাকিস্তানের হাত আছে, পরিস্কার জানালেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।
ঘটনার দায় স্বীকার করেছে পাক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ৷ বিস্ফোরণে যুক্ত আদিল আহমেদ নামে এক জইশ জঙ্গির নাম উঠে আসছে তদন্তে। তার ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। সেনা সূত্রে খবর, বিস্ফোরক ভরতি বোঝাই গাড়িটি আদিলই চালাচ্ছিল৷। বেশ কিছু জঙ্গি আগে থেকেই একটু উঁচু জায়গায় পজিশন নিয়ে রেখেছিল বলেই মনে করা হচ্ছে। এটাকে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের বদলা বলেই দাবি করেছে জঙ্গি সংগঠন জইশ ই মহম্মদ।
গতকাল থেকেই জঙ্গিদের খোঁজে চলছে নাকা তল্লাশি। লোকসভার আগে এই ধরনের জঙ্গি হামলার আভাস আগেই দিয়ে রেখেছিলেন গোয়েন্দারা। এমনকী, ৮-১০ দিন আগেও উপত্যকার সেনাকে সতর্ক করা হয় বলে সূত্রের খবর৷ কিন্তু তাও কেন এই ধরনের হামলা এড়ানো গেল না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন৷ উরির পর এই প্রথম এত বড় মাপের একটি হামলা ঘটাল জঙ্গিরা।
ঘটনার খবর পাওয়ার পরেই সাঁতরা পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাড়িতে ভিড় করেছেন গোটা পাড়ার মানুষ। পরিবারটি যাতে অসুবিধার মধ্যে না পরে তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দরবার করবে পাড়ার মানুষ।
]]>